Wednesday, December 7, 2016

ফাঁসি

লেখক-জাকারিয়া জ্যাক

আসামীর কাঠগড়ায় শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বনী ইসরাইল। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। এরকম দাড়িতে সবাইকে মানায় না, বনীকে খুব মানিয়েছে। পাবলিক প্রসিকিউটর সেলিম খানকে দেখে বনীর মুখে চিন্তার আভা দেখা গেল যেমনটা শরতের আকাশে হঠাৎ করে মেঘ দেখা যায়।
-কী হল মি. বনী? মুখটা এমন পাংশুবর্ণ হয়ে গেল কেন?
-তেমন কিছু না। তবে আপনাকে কোথায় যেন দেখেছি। মনে পড়ছে না। বলেন তো, কোথায় দেখেছি?
-তা পরেও জানতে পারবেন। আগে আপনার বিচার হোক।
কিছুক্ষণের মধ্যে জজসাহেব প্রবেশ করছেন। সিনেমায় আদালতের পরিবেশটা খুবই রোমাঞ্চকর কিন্তু বাস্তবে সেরকম না। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আদালতের কাজ শুরু হল। পাবলিক প্রসিকিউটর সেলিম খানের সাক্ষ্যপ্রমাণ ছিল খুবই দৃঢ়। ডিফেন্স ল'য়ার ডিফেন্স করতে পারলেন না। অবশেষে জজসাহেব রায় ঘোষণা করলেন, বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ৩০২ ধারা মোতাবেক আদালত আসামী বনী ইসরাইলকে জনাব সাইফুল ইসলামের খুনের অপরাধে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ দিচ্ছে।
সাক্ষর শেষে জজসাহেব কলমের নিবটা ভেঙে দিলেন। বনী ইসরাইলের ঠোঁটে অস্ফুট হাসি দেখা যাচ্ছে। সেই হাসিতে বুঝিয়ে দিচ্ছে একজন আসামির আকুতি, আমি কি সত্যিই অপরাধী?
আসামী বনী ইসরাইলকে জেলহাজতে নেওয়ার আগে পাবলিক প্রসিকিউটর সেলিম খান বললেন, আমাকে কি এখন চিনতে পারছেন?
খুবই মৃদুস্বরে বনী উত্তর দিল, হ্যাঁ, চিনতে পেরেছি। কিন্তু একটা প্রশ্ন করব, যদি উত্তর দেন।
-শেষ ইচ্ছা?
-ইচ্ছার কখনো শেষ হয় না। আমার ইচ্ছা তো হয়, আপনার সাথে হাইওয়েতে গিয়ে রাস্তার পাশে পা ছড়িয়ে বসে গল্প করা। সেই ইচ্ছা কি পূরণ হবে?
-যাইহোক, কী জানতে চাচ্ছিলেন?
-আমার খোঁজ পেলেন কিভাবে? আর আমি খুন করেছি এটাই বা আপনাকে কে বলল?
-প্রত্যেক অপরাধী কিছু প্রমাণ রেখে যায়। তবে আপনাকে প্রমাণের ভিত্তিতে ধরিনি, ধরেছি যে আপনাকে খুন করে পালাতে দেখেছে, তার সাক্ষ্যের ভিত্তিতে।
-কে দেখেছে? আর আপনি তো সেই কথা আদালতে বলেননি।
-সেই সাক্ষ্য ছাড়া যেহেতু প্রমাণ করতে পেরেছি, তাই বলার দরকার ছিল না।
-কে দেখেছে, এটা কী বলবেন?
-কেন? এবার তাকে খুন করবেন?
-জেল থেকে নিশ্চয় আমাকে খুন করার জন্য ছুটি দিবে না।
-হাহাহা, আপনার সেন্স অফ হিউমার দেখে অবাক হচ্ছি। যাইহোক, সাইফুল ইসলামের এক প্রতিবেশি কবির আপনাকে খুনের দিন রাত আটটার দিকে সেই বাড়ি থেকে বের হতে দেখেছে।
-ধন্যবাদ। আবার দেখা হবে।
-আশা করছেন?
আশা করা পাপ নয়। খুন করা পাপ।
বনী ইসরাইলকে নিয়ে পুলিশ চলে গেল। ক্রিমিনাল ল'য়ার সেলিম খান খুবই আনন্দিত কারণ তার রেকর্ডে আরেকটা জয় যুক্ত হল।
কয়েকমাস আগের কথা, বনী তার ঘরে বসে আছে খালি গায়ে। মাথার উপর ফ্যানটা এতই ধীরে ঘুরছে যে তার ঘূর্ণন সংখ্যা গোনা যায়। হাতের সিগারেট ফেলে দিয়ে ব্যায়াম করতে শুরু করল। তখনি ফোনে একটা এসএমএস আসে।
কিছুক্ষণের মধ্যে বনীর পরিচিত একটা ছেলে আসে। সে নিয়মিত বনীর বডি মাসেজ করে দেয়। মাসে ছয়শো টাকা। সরিষা তেল আর রসুন চামচে নিয়ে মোমবাতির আগুনে গরম করে। সেই গরম তেল দিয়ে ঘাড়, পিঠ, হাত মাসেজ করে। ছেলেটা চলে গেলে বনী তার প্র‍্যাক্টিস শুরু করে। অদ্ভুত একটা অনুশীলন যা বিফল হলে মৃত্যুর সম্ভাবনা থাকে। বনীর জীবনে ব্যর্থতা নেই। সে বিফল হতে জানে না।
ওষুধ শেষ হয়ে গিয়েছে। এদেশে এই ওষুধ পাওয়া যায় না। সুইডেন থেকে তার বন্ধু প্রতিমাসে তার ওষুধ পাঠায়। বনী ফোন করল, হ্যালো।
-হ্যা, বল।
-ওষুধ শেষ।
-দুইদিন আগেই ওষুধ পাঠিয়েছি। আজ পৌঁছে যাবার কথা।
-ওকে, আমি খোঁজ নিচ্ছি।
-কাজটা হবে তো?
-বনী কোন কাজে ব্যর্থ হয় না। আর এটা আমার জন্য সবচেয়ে বড় কাজ। ভুল হবে না। নিশ্চিন্তে থাক। আর একটা কাজ করতে হবে।
-কী?
-প্র‍্যাক্টিস ভালই চলছে। আমি চাচ্ছি আরও ভাল হোক। কোন রিস্ক নিতে চাচ্ছি না।
-কী করতে হবে?
-ইতালি যাবি। সেখান থেকে একটা.....
-ওকে। এই সপ্তাহের মধ্যে চেষ্টা করব।
বনী এয়ারপোর্টে খোঁজ নিল সুইডেন থেকে তার নামে কোন পার্সেল এসেছে কি না। তারা জানালো যে কিছুক্ষণ আগেই এসেছে। বনী দেরী করল না। ওষুধটা নিয়মিত খেতে হয়। মিস হলে সমস্যা হতে পারে। তখন হিতে বিপরীত হবে। অবশ্য আর একমাস নিয়মিত খেলে কোর্স কমপ্লিট হয়ে যাবে।
পার্সেল রিসিভ করল বনী। এবার তিনটা কৌটা দিয়েছে। দুইটা ভেনটম আর একটা পি-ব্রেকার। খুবই কাজের ওষুধ। বনী ওষুধ নিয়ে বাসায় এসে পি-ব্রেকার খেয়ে ধ্যানে বসল। পি-ব্রেকার ধ্যানের জন্য মহৌষধ।
যে ছেলেটা মালিশ করে সে এসে দেখে দরজা বন্ধ। এসময় বনীর দরজা বন্ধ থাকে না। সে কি করবে কি করবে না ভাবতে ভাবতে জানালা দিয়ে উঁকি দিল। ভিতরে দেখে কেউ একজন ঝুলে আছে। ভয়ে ছেলেটার বুক ধকধক করছে। দরজায় জোরে ধাক্কা দিল। না, দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। সিনেমার নায়ক হলে এক লাথি দিয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকা যেত। কিছুক্ষণ ধাক্কাধাক্কি করার পর ভিতর থেকে দরজা খুলে দিল বনী। ছেলেটা দেখল, সিলিংয়ের রিংয়ের সাথে লম্বা দড়ি আর সেই দড়িতে একটা বালির বস্তা ঝুলে আছে। তাহলে কি তার দৃষ্টিবিভ্রম হয়েছিল?
খালি গায়ে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল বনী। আজ ছেলেটার মালিশ অন্যদিনের মত না। বনী জিজ্ঞেস করল, কিরে? ঠিকমত মালিশ করছিস না কেন?
-না মানে, ইয়ে...
-মানে মানে না করে কী বলবি বল। টাকা লাগবে?
-না। আমি জানালা দিয়ে দেখলাম....
-অর্ধেক কথা বললে থাপ্পড় খাবি। কী দেখলি?
-দেখলাম আপনি গলায় ফাঁস নিয়েছেন।
-হাহাহা। এই কথা? শোন, তুই ভুল দেখেছিস। ভাল করে মালিশ কর। ঘাড়টা ব্যথা করছে।
ছেলেটা গরম সরিষার তেল দিয়ে মালিশ শুরু করল।
এক সপ্তাহ পর ইতালি থেকে জিনিসটা এসে গেল। খুবই প্রয়োজনীয় এটা। প্র‍্যাক্টিসের জন্য সবচেয়ে ভাল হবে। এরপর থেকে বনী সকাল বিকাল ধ্যান আর অনুশীলন নিয়েই ব্যস্ত থাকল।
শান্তি কটেজ। এক সপ্তাহ পর, ভরসন্ধ্যায় বনী এখানে এল। আগে একটা সময় বনী প্রায়ই আসত কিন্তু গত দুই তিন বছর ধরে আসা হয় না। শান্তি কটেজে সাইফুল ইসলাম একাই থাকেন। তার ছেলে বিদেশ থাকে। একটা কাজের মেয়ে ছিল, কয়েকদিন আগে তাকে ছাড়িয়ে দিয়েছে। কারণটা অজ্ঞাত। ভিতরে গিয়েই বনী দেখল, সাইফুল ইসলাম সাহেব ইজিচেয়ারে বসে আছেন।
-আঙ্কেল, কেমন আছেন?
-ভাল, তুমি?
-জ্বি আঙ্কেল, আমি বনী। বনী ইসরাইল।
-এতদিন পর? তোমার কোন খোঁজ ছিল না কেন? রাফি বাইরে যাওয়ার পর তুমি আমাকে ভুলেই গেছ। কখনো মনে কর না।
-না, আঙ্কেল। মনে করি। আসলে সময়টা হচ্ছিল না।
-ও তা হঠাৎ কী মনে এসেছ? ও হ্যাঁ, কী খাবে?
-কিছু খাব না।
চারদিক ভাল করে দেখে নিল বনী। সাইফুল ইসলাম জিজ্ঞেস করল, কোন কাজে এসেছ?
-জ্বি, আপনাকে খুন করতে এসেছি।
সাইফুল ইসলামের চোখ অক্ষিকোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হল। তিনি উঠতে যাবেন, তখনি বনী তার বুকে পা দিয়ে চেপে ধরল।
-উঁহু, যেভাবে আছেন, ওভাবেই থাকেন। আপনাকে অপশন দিচ্ছি, কিভাবে মরবেন?
-কী হয়েছে বনী? এরকম করছ কেন?
-গল্পটার শুরু অনেক আগেই, আজ শেষ।
বনী পিস্তল বের করল। সাইফুল ইসলামের বুকে ঠেকিয়ে পরপর তিনটা গুলি করল। কোন শব্দ হল না। পিস্তলে সাইলেন্সার লাগানো ছিল।
বৃষ্টি শুরু হয়েছে। হালকা বৃষ্টিতে রাস্তায় ভালই পানি জমেছে। পানির মধ্য দিয়ে থপথপ করে চলে গেল বনী।
পুলিশ সেইরাতে এসে লাশ নিয়ে গেল। প্রাথমিক ময়নাতদন্ত করার পর কেস ফাইল করা হয়েছে। পাবলিক প্রসিকিউটর সেলিম খান এই কেস পেয়েছেন। তিনি অনেক কষ্টে প্রমাণ ও সাক্ষ্য জোগাড় করলেন।
দারোগা সাহেব, আপনারা কিভাবে জানলেন যে সাইফুল ইসলাম খুন হয়েছিলেন?
-ওনার এক প্রতিবেশি থানায় ফোন করেছিল।
-তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন?
-না, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার কিছু নাই।
-আই সি।
সেলিম খান চলে গেল সাইফুল ইসলামের প্রতিবেশি কবির মিয়ার কাছে।
-তুমিই তো পুলিশে ইনফর্ম করেছিলে?
-স্যার, আমি ওইদিন রান্না করছিলাম। আমার রান্নাঘর থেকে সাহেবের বাড়িটা দেখা যায়। হঠাৎ দেখলাম, কেউ বাড়ি থেকে বের হচ্ছে। আমি তাকে আগেও এই বাড়িতে যাতায়াত করতে দেখেছি। মুখে চাপদাড়ি, ইসমাইল না, ইসরাফিল কী যেন নাম।
সেলিম খান সাইফুল ইসলামের বাড়িতে কিছু ছবি দেখল। তার ছেলের সাথে অন্য কারও ছবি। বুঝতে বাকি রইল না যে এই ছেলেটা সাইফুল ইসলামের ছেলে রাফির বন্ধু। আর কবির মিয়ার বর্ণনা অনুযায়ী এই খুনি।
-আচ্ছা, তুমি কিভাবে জানলে যে খুন হয়েছে?
-ওই ছেলেটা চলে যাওয়ার অনেক পর, রাত এগারোটার দিকে শুনলাম, সাহেবের কুকুরটা কেমনভাবে গর্জন করছিল। আর এত রাত পর্যন্ত সাহেবের ঘরে আলো জ্বলে না। তাই আমি এলাম। এসে দেখি সাহেব চেয়ারে মরে পড়ে আছে, মেঝেতে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।
পুলিশের সহায়তায় সেলিম খান বনীকে ধরল। আর আদালত তাকে ফাঁসির রায় দিয়েছে। বনী হাইকোর্টে আপিল করেনি। আগামী একমাসের মধ্যে ফাঁসি কার্যকর করা হবে।
হাজতে ভালই দিন যাচ্ছে বনীর। একদিন জেলার সাহেব এলেন।
-কেমন আছেন বনী ইসরাইল?
-ভাল আছি স্যার, আপনি কেমন আছেন?
-ভাল। আচ্ছা, আপনার কি আপন কেউ নাই?
-কেন?
-এতদিনে কেউ আপনার সাথে দেখা করতে এল না তো তাই। আর কেউ আপনার জন্য উচ্চ আদালতে আপিল করেনি।
-না, আমার কেউ নাই।
-একজন জেলার হয়ে এধরণের কথা কাউকে বলিনি। আপনাকে বলছি, আপনার ফাঁসি হবে, খারাপ লাগে না?
-না। কারণ ফাঁসির হাত থেকে বাঁচলেও মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচা তো সম্ভব নয়।
-হুম, তা ঠিক। আচ্ছা, আপনার কি কিছু খেতে ইচ্ছে করে?
-কতকিছুই তো খেতে ইচ্ছে করে।
-দুই একটার নাম বলেন। আমরা ব্যবস্থা করব।
-শেষ ইচ্ছা? হাহাহা
জেলার সাহেব অবাক হল। কেমন অপ্রকৃতিস্থ পাগলের মত হাসি। হাসির সাথে শরীর কেঁপে কেঁপে ওঠে।
বনী বলল, আমার খাওয়ার ইচ্ছা পূরণ না করলেও চলবে। কিন্তু একটা ইচ্ছা পূরণ করতে হবে।
-বলুন, কী?
-দুইদিন পর পূর্ণিমা। আমি পূর্ণিমার আলোয় গোসল করব। তারপর আমাকে ফাঁসি দিবেন।
বনীকে কনডেমন্ড সেলে নেওয়া হয়েছে। সাদা টুপির পরিবর্তে লাল টুপি পরানো হয়েছে। একটা বই পড়ছিল বনী। জীবনান্দের কবিতা, আবার আসিব ফিরে, ধানসিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়
হয়তো মানুষ নয়, হয়তো শঙ্খচিল বা শালিকের বেশে।.....
একজন ইমাম এসেছেন। তিনি বনীকে তওবা পড়াবেন, নামাজ পড়াবেন।
-ইমাম সাহেব, আমি একাই নামাজ পড়তে পারি। আপনি আমাকে একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন?
-জ্বি, বলেন।
-যুদ্ধক্ষেত্রে কাউকে খুন করা কি পাপ?
এমন প্রশ্নে ইমাম সাহেব ভ্যাবাচ্যাকা খেলেন। তিনি উত্তরটা জানলেও বললেন না। তওবা পড়িয়ে চলে গেলেন।
ডাক্তার এলেন। জ্বর, রক্তচাপ এসব পরীক্ষা করলেন। রক্তচাপ ঠিক আছে কিন্তু পালস্ মাঝে মাঝে দুইএকটা মিস হচ্ছে। ডাক্তারের ভ্রু কুঞ্চিত হল।
-কী হল ডাক্তার সাহেব?
-পালস্ মিস হচ্ছে মনে হল।
-হাহাহা, কিছু না। আমি ফিট আছি, আনফিট নই।
-ওকে।
-ডাক্তার সাহেব, একটা প্রশ্ন ছিল।
-বলেন।
-আমাকে কতক্ষণ ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রাখবেন?
ডাক্তার কোন জবাব দিল না। অস্ফুট একটা হাসি দিলেন, সেই হাসির অর্থ হল, হায়রে বেচারা, কিছুক্ষণের মধ্যেই যার মৃত্যু সে কি না ঝুলে থাকার স্থায়িত্বকাল জানতে আগ্রহী।
রাত বারোটা বাজে। খোলা আকাশের নিচে উপর দিকে তাকিয়ে আছে বনী। আকাশ থেকে বৃষ্টির মত জোসনা ঝরছে। এরকম জোসনা জীবনে খুব কম দেখেছে বনী। হঠাৎ কিছুক্ষণের জন্য বনীর মুখের উপর অন্ধকার পড়ল। একটুকরো মেঘ কিছুক্ষণের জন্য চাঁদের আলোকে আড়াল করে দিয়েছে। পরক্ষণেই আবার ঝকঝকে আকাশে কোজাগরী চাঁদ।
দুইজন পুলিশ দুই দিক থেকে ধরে ফাঁসির মঞ্চের দিকে নিয়ে যাচ্ছে বনীকে। ছুটে যাওয়ার জন্য বনী ছটফট করছে না। সাধারণত ফাঁসির আসামী এই সময় খুব ছটফট করে। বনী পুলিশকে বলেছিল, আমি নিজেই যেতে পারব। পালিয়ে যাব না। আমার হাত ছেড়ে দিন। পুলিশ দুইটা শুধু তাকালো বনীর দিকে কিন্তু তার কথা শুনল না। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছে। জেলার সাহেব, উকিল, ডাক্তার, দুইজন জল্লাদ উপস্থিত।
-আমার ফাঁসি যে জল্লাদের হাতে হবে, তার নামটা জানতে পারি?
উপস্থিত সবাই সবার মুখের দিকে তাকাচ্ছে। জল্লাদ গিয়ে কালো জমটুপি পরিয়ে দিল। হাতপা শক্ত করে বাঁধা হল। গলায় পরানো হল ফাঁসির দড়ি। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব রুমাল হাতে নিয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আছেন আর জল্লাদ তাকিয়ে আছে ম্যাজিস্ট্রেটের দিকে।
রুমালটা ছেড়ে দিলেন। জল্লাদ সাথে সাথে একটা সুইচ চাপ দিল। বনীর পায়ের নিচ থেকে কাঠটা সরে গিয়ে ফাঁকা হয়ে গেল। বনী দড়িতে ঝুলে থাকা অবস্থায় নিচের দিকে দ্রুত গতিতে নেমে যাচ্ছে। হঠাৎ ঘোঁৎ করে একটা শব্দ। ডাক্তার নিচে নেমে যাচ্ছে, তার পিছনে জেলার সাহেব।
হাত ধরে পালস্ দেখ ডাক্তার। না, পালস্ নেই। তার মানে মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। তিন মিনিট ঝুলিয়ে রাখার পর লাশ নামানো হয়েছে। ডাক্তার লাশের শিরা কাটতে গেলে জেলার সাহেব বলল, মৃত্যু নিশ্চিত হলে শিরা কাটার দরকার নেই।
-কেন?
-ওর শেষ ইচ্ছা ছিল এটা।
শিরা কাটা হল না। ডাক্তার ডেথ সার্টিফিকেট রেডি করছে। একজন পুলিশ খেয়াল করল ডেডবডির পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি নড়ে উঠেছে। সে ডাক্তারকে বলতে গিয়েও বলল না। শুধুশুধু ধমক খাওয়ার কোন মানে নেই।
ডেডবডি ওখানে রেখে বের হচ্ছে সবাই। গেটের কাছেই আসতে ভিতর থেকে বিকট ভয়ঙ্কর শব্দ শোনা যাচ্ছে। ডাক্তার থমকে দাঁড়ালো। ডাক্তারের সাথে ওরা সবাই। জেলারের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি যা শুনছি, আপনারাও কি তাই শুনছেন?
জেলার সাহেব কোন উত্তর দিলেন না। তিনি প্রায় দৌঁড়ে ওদিকে গেলেন। তার পিছনে সবাই ছুটছে। গিয়ে যা দেখল, সবারই মাথাখারাপ অবস্থা। বনী বমি করছে। ভেদবমি, গলা দিয়ে গলগল করে রক্ত পড়ছে। তারমধ্যেও সে সবার দিকে তাকালো। রক্তমাখা মুখে একটা অস্ফুট হাসি যেন সে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয়লাভ করেছে। ডাক্তার ইমার্জেন্সী তাকে হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ দিলেন।
পরদিন পত্রিকার নিউজে হেডলাইন, "ফাঁসির মঞ্চ থেকে বেঁচে ফিরলেন বনী ইসরাইল" অনেক সাংবাদিক আসছে তার সাক্ষাতকার নেওয়ার জন্য। কিন্তু পুলিশ সাক্ষাতকার নিতে দিচ্ছে না। এক পর্যায়ে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে পুলিশ বনী ইসরাইলকে অন্যত্র শিফট করল। রাত এগারোটার দিকে ডিউটি অফিসার হেডকোয়ার্টারে ফোন দিল, কিছুক্ষণ আগে লোডশেডিং হয়েছিল। বনী সেই সুযোগে পালিয়ে গেছে।
সেলিম খান খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে গিয়েছিলেন। কিন্তু তার আগেই বনী পালিয়েছে। সেলিম খানের মুখে সেই আনন্দ উবে গেল।
রাত দুইটা। ঘুম আসছে না। রাতের শেষ সিগারেট ধরাবে ঠিক তখনই একটা কল এল, উকিল সাহেব, ঘুম আসে না?
পরিচিত কণ্ঠ। সেলিম খানের বুঝতে অসুবিধা হল না যে এটাই বনী ইসরাইল।
-জ্বি হ্যাঁ, মানে না...
-চলে আসুন। বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের কাছে।
শেখ সেলিম দেরী করলেন না। গাড়ি নিয়ে বের হয়ে পড়লেন। রাস্তা ফাঁকা, শো শো করে গাড়ি টানছেন। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে এলেন।
বনীর মুখে দাড়ি নেই। ক্লিন শেভ করেছে। মুখে কোন ক্রিম মেখেছে তাই ভুরভুর করে গন্ধ আসছে। গন্ধটা খারাপ না। অনেকটা শিউলিফুলের গন্ধের মত। হাইওয়ের পাশে ঘাসের উপর পা ছড়িয়ে বসে আছে বনী ইসরাইল আর সেলিম খান। সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এটা কিভাবে সম্ভব?
-ইংলিশে একটা কথা আছে, Practice makes a man perfect.
-হুম, কিন্তু....
-কোন কিন্তু নেই। শেক্সপিয়রের একটা কথা, There are many things in heaven & earth. ম্যাকবেথ পড়েছেন?
-হুম।
-আচ্ছা, টেলিভিশনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এক্সট্রা-অর্ডিনারি কিছু দেখায় যেমন গরম কয়লা খাচ্ছে, চুল দিয়ে ট্রাক বেঁধে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। দেখেছেন?
-হুম।
-বিশ্বাস করেন?
-না করার কি আছে?
-তাহলে এটা জেনে রাখুন, আমি ফাঁসিতে মরব না।
-ওরা তো অনেক সাধনা করে এগুলো আয়ত্ত করে।
-আরে উকিল সাহেব, আপনি তো সবই জানেন। এত ভণিতা করছেন কেন?
-মানে?
-আমাকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে গেলে আপনি আমার ঘর থেকে ওষুধ নিয়ে গেছেন। ভিটামিন ট্যাবলেটের কৌটায় ছিল। আর ইন্টারনেটে খোঁজ নিয়েছেন যে ওগুলো কিসের ওষুধ। ভেনটম ঘাড় ও গলার শিরা শক্ত করে আর পি-ব্রেকার আপনার পালস্ হাইড রাখে।
-হুম। কেন করলেন?
-কী?
-খুন।
-তার আগে একটা গল্প বলি। সিগারেট দেন।
সিগারেট ধরিয়ে বনী বলা শুরু করল, আমি ছোটবেলায় বাবাকে হারাই। মা এক বাড়িতে কাজ করত। সেই বাড়ির মালিক আমার মায়ের জীবন শেষ করে দেয়। মা সুইসাইড করে। কিন্তু পুলিশে জানানো হয় স্বাভাবিক মৃত্যু। কারণ ঐ লোকের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে মা আত্মহত্যা করে। মালিকের বৌ ভাল মানুষ ছিলেন। তিনি আমাকে তাদের সাথেই রেখে দিলেন। তার ছেলের সাথে আমার খুব বন্ধুত্ব হল। যেনতেন বন্ধুত্ব না, জানেজিগার দোস্ত। মালিকের নারীর নেশা আরও প্রকট হতে লাগল। এক পর্যায়ে মালিকের স্ত্রী এর প্রতিবাদ করলে তিনি খুন হন। আমি আর আমার বন্ধু একই পরিস্থিতির শিকার। কিন্তু তখন আমাদের কিছুই করার ছিল না। লেখাপড়া শেষ করে সে সুইডেনে চলে যায়। আমি এখানে পরিকল্পনা করি আর ও ওখান থেকে সব ধরণের সাপোর্ট দেয়।
কিছুক্ষণ দম নিয়ে বনী বলল, আমার বন্ধুর নাম রাফি আর তার বাবা সাইফুল ইসলাম।
বনী থামল। কিছুক্ষণ চুপচাপ। সুনসান পরিবেশ। হাইওয়েতে মাঝেমধ্যে দুইএকটা গাড়ি শাঁ শাঁ করে চলে যাচ্ছে। সেলিম খান জিজ্ঞেস করল, আপনি কি জানতেন যে ধরা পড়বেন?
-জানতাম ঠিক না, তবে সতর্কতা বলতে পারেন। আর আমার এই মিশন চলতেই থাকবে। কেউ আমার কিচ্ছু ছিঁড়তে পারবে না। হা হা হা।
বনীর হাসিতে জোসনা পর্যন্ত কেঁপে কেঁপে উঠছে।

No comments:

Post a Comment