Friday, December 2, 2016

তুমি রবে নীরবে, হৃদয়ে মম

লেখক-জাকারিয়া জ্যাক

(২০০৮ সালের কথা। আমার এক ভাতিজীর কাছে হুমায়ূন আহমেদ স্যারের বিখ্যাত সৃষ্টি 'মিসির আলির দুইটা গল্প শুনলাম। তারপর থেকে আমি হুমায়ূন-পাগল। কল্পনায় তার সাথে দেখা করতাম, কথা বলতাম। ২০০৯ এ তার সাথে আমার দেখা হওয়ার একটা ঘটনা লিখেছিলাম। আজ ফেসবুকের কল্যাণে তা প্রকাশ করছি। ভুলত্রুটি ক্ষমাযোগ্য)
নুহাশপল্লীতে এসেছি। অনেক কষ্টে ভিতরে ঢুকলাম। স্যারের বাসার দারোয়ান আমাকে আমার প্রথম কথায় পাগল সাব্যস্ত করল।
-দারোয়ান ভাই, ভাল আছেন?
-জ্বি, আপনি কে?
-আমি জ্যাক, হুমায়ূন এর বাল্যকালের বন্ধু।
আমার এই উত্তরে দারোয়ানের মুখ ব্ল্যাকহোলের মত হা হয়ে গেল। সে মনের কথা মুখেই প্রকাশ করল, পাগল কোথাকার। যা, ভাগ। নাহলে ওইযে বিদেশি এলসেশিয়ান দেখছিস, ওটা?
-ওটা কী খরগোশ?
দারোয়ান দেখল, এ তো ভালই পাগলের পাল্লায় পড়েছে। ইন্টারকমে স্যারের সাথে কথা হল,
-স্যার, একটা পাগল এসেছে?
-পাগল? বুঝলে কী করে?(আমি স্যারের কথাও শুনতে পাচ্ছি)
-সে বলছে, সে নাকি আপনার বন্ধু।
-তার মানে আমার বন্ধু হলেই সে পাগল? আমার সব বন্ধু পাগল?
-না স্যার, আমি তা বলছি না। বলছে, আপনার বাল্যকালের বন্ধু।
-আমার কি বাল্যকালের বন্ধু থাকতে পারে না?
-এই ছোকরা আপনার বাল্যকালের বন্ধু হয় কিভাবে?
-ওকে তুমি উপরে পাঠিয়ে দাও।
-ঠিক আছে, স্যার।
দারোয়ানের মুখটা পাংশুবর্ণ হয়ে গেল। আমি ভিতরে ঢুকলাম। কিছুদূর গিয়ে দারোয়ানকে ডেকে বললাম, দারোয়ান, এলসেশিয়ান খরগোশকে খাবার দাও।
দারোয়ানের মনের ভাব আমি বুঝতে পারছি। সে আমাকে মনেমনে অনেক গালি দিচ্ছে। এবং মুখে না বললেও তা মুখের উপর ছায়া ফেলছে। তোয়াক্কা না করে আমি ঘরে ঢুকলাম।
স্যারকে দেখলাম, সোফায় গা এলিয়ে শুয়ে সিগারেট টানছেন। বাহ! কী অপরূপ ভঙ্গিতে সিগারেট টানেন তিনি! আমি স্যারের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার বন্ধু? কেমন আছিস? বস।
আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছি। স্যার যে এভাবে কথা বলবেন, আমি কল্পনাও করিনি।
-সরি স্যার, আসলে আপনার সাথে দেখা করার খুব ইচ্ছে ছিল। কিন্তু কিভাবে করব? আমার মত একজন নগণ্য মানুষ কিভাবে আপনার সাথে দেখা করতে পারে, বলেন স্যার?
-নগণ্য মানে? তোকে কি গোনা হয়নি? আদমশুমারিতে বাদ পড়ে গেছিস?
আমি কি বলব বুঝে উঠতে পারছি না। স্যার জোরে কাউকে ডেকে বললেন, এই কে আছিস? আমার নগণ্য বন্ধুকে চা নাস্তা দে।
আমাকে বসিয়ে রেখে স্যার উঠলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে কাজের ছেলেটা চা নাস্তা নিয়ে হাজির। চায়ে চুমুক দিয়ে আমার মুখ বেঁকে গেল। একফোঁটা চিনি দেয়নি। হুমায়ূন স্যার ফিরে এসেছেন। আমাকে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বসে থাকতে দেখে তিনি বললেন, কী হল? চা খা। নাকি খেতে পারছিস না?
-না মানে...
-চিনি দেয়নি?
-হুম।
-আরে, আমার বেশিরভাগ বন্ধু ডায়াবেটিস রোগী। এইজন্য চিনি ছাড়া চা দেয়। তোর ডায়াবেটিস নাই?
-না স্যার।
আমি চিনি ছাড়া লিকার চা খেয়ে যাচ্ছি। কিছুক্ষণের মধ্যে স্যারের স্ত্রী এলেন। আমি তাকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়লাম। আমার হাত থেকে চায়ের কাপ মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেল। চোখ ছলছল করে উঠছে।
স্যার বুঝতে পেরে পেরে বলল, আমার স্ত্রী।
-স্যার, আপনি অবাক হবেন শুনে। আমার একটা খালাতো বোন ছিল, গতবছর মারা গেছে। দেখতে অবিকল আপনার স্ত্রীর মত।
-তাই?
-জ্বি স্যার।
-তুমি টিভি দেখ না?
-জ্বি না।
-আমি ভেবেছিলাম, আগেই তুমি শাওনকে দেখেছ।
শাওন ম্যাডাম আমাকে বলল, ঠিক আছে। আজ থেকে আমিই তোমার বোন।
স্যার বললেন, যাক বাবা। আমার আরেকটা শালা হয়ে গেল। আমি তো দেখছি তোমার জন্য জাতীয় দুলাভাই হয়ে যাব। সবাইকে এইভাবে ভাই বানাচ্ছ যে তাই।
আমরা কিছুক্ষণ এভাবে গল্পগুজব করে কাটালাম।
স্যার বললেন, তুমি যখন এসেছিলে, আমি বেলকনি থেকে সব দেখছিলাম আর শুনছিলাম। তাই তোমাকে একটু বোকা বানালাম আর কী?
-আমি বুঝতে পারছি স্যার। কিন্তু আপনার সেন্স অব হিউমার যে এত ব্যাপক, এটা আমি কল্পনা করিনি।
-তোমাকে বেশ বুদ্ধিমান মনে হচ্ছে।
আমি একটা ফুল পকেট থেকে বের করে স্যারকে দিয়ে বললাম, শুভ জন্মদিন স্যার।
-আজ আমার জন্মদিন?
-জ্বি।
-কিভাবে?
-আপনি ভূমিষ্ঠ হয়েছেন ১৩ নভেম্বর কিন্তু আপনার জন্ম তো দশমাস দশদিন আগেই হয়েছে।
স্যার কিছুটা চমকে গেলেন। শাওন ম্যাডাম আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমার এরকম লজিক তিনি কল্পনাও করেননি হয়তো।
আমি চলে এলাম। আমাকে বিদায় দিতে এগিয়ে এলেন না। বসে রইলেন সেখানেই। স্যারের হাতে ছিল আমার দেওয়া পদ্মফুল।
দারোয়ানকে বললাম, এরপর আমি যখন আসব, তখন গেট খুলে দিয়ে স্যালুট করবে। মনে থাকবে?
-জ্বি স্যার।
আমি বেরিয়ে পড়লাম। স্যার তার লেখায় মানুষকে ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়ে দেন। আমি আজ তাকে অবাক করে দিলাম। আমার কোন খালাতো বোন নেই। আর আমি শাওন ম্যাডামকে আগে থেকেই জানি। তিনি আমার এই অভিনয়টা ধরতে পেরেছেন কি না জানি না। সবকিছু জানতে নেই।
শুভ জন্মদিন স্যার, আপনি ছিলেন, আপনি আছেন, আপনি থাকবেন। তুমি রবে নীরবে, হৃদয়ে মম।

No comments:

Post a Comment